writing/essays/on-staying-small.bn.md
[en][bn]

কোচিং সেন্টার দিলেই তো পারো!

nj · মে ২০২৬

আগে এ ব্যাপারে আমি অনেক বেশি স্পষ্ট ছিলাম। ২০১৪ সালে, কলেজে সদ্য উঠেছি, নিজের রুমে একটা পোস্টার লাগিয়েছিলাম। তাতে লেখা ছিল: পড়াশোনা হওয়া উচিত জ্ঞানের জন্য, আনন্দের জন্য, মনের আর আত্মার প্রশান্তির জন্য — পরীক্ষায় পাশ করার, কোথাও টিকার, বা চাকরি করে বাঁচার জন্য নয়।

মানুষ হেসেছিল। আমার বয়স তখন ২০। বিশ বছরের ছেলেরা যেমন কথা দেয়ালে টাঙায়, তেমনই কথা।

এখন আমার ২৭। পোস্টারটা অনেক বছর আগেই দেয়াল থেকে নেমে গেছে। মাঝখানের সময়ে অনেক জায়গায় সিভি জমা দিয়েছি — কতো জায়গায় মনেও নেই। সেগুলোর মধ্যে একটায় ৮ মাস চাকরিও করেছি। একটা স্টার্টআপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি, ওটা আটকে গেছে। কিছু সময়ের জন্য আমিও সেই গতানুগতিক রাস্তায় হেঁটেছি, যেগুলোকে আগে আমি তুচ্ছ করতাম।

এগুলোর কোনোটাই আমার চিন্তাভাবনা বদলাতে পারেনি। বরং ধারণাটা আরও পোক্ত হয়েছে।

২০ বছরের সেই ক্ষুধা এখনো আছে। যেটা বদলেছে সেটা হল — এখন আর সেটা ঘোষণা করার দরকার পড়ে না। পোস্টারটা দেয়াল থেকে নেমে গেছে তার মানে এই না যে আমি ওসব বিশ্বাস করা ছেড়ে দিয়েছি; বরং আমার নিজের অবস্থানটা সবাইকে দেখিয়ে বেড়ানোর আর প্রয়োজন পড়ে না। এটা এখন ভেতরে ভেতরে, নিঃশব্দে বাঁচে। এর ধার একটুও কমেনি।

এই লেখাটা একটা নির্দিষ্ট জিনিস নিয়ে যেটা আমি এখনো করব না।

// কোচিং জিনিসটা আসলে কী

কোচিং সেন্টার বাংলাদেশের একটা বিশেষ ইন্ডাস্ট্রি। সাধারণত একজন শিক্ষক— অথবা ছোট একটা দল— নির্দিষ্ট কিছু বিষয় শত শত, বা কখনো হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে ব্যাচে পড়ান। তাঁরা ক্লাসরুম ভাড়া নেন। তারা ক্লাসরুম ভাড়া নেন। অনলাইনে-অফলাইনে বিশাল বিজ্ঞাপন দেন। এসএসসি, এইচএসসি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল বা পাবলিক ইউনিভার্সিটির এডমিশন— এই নির্দিষ্ট পরীক্ষার টার্গেটগুলোকে ঘিরেই তাদের ব্র্যান্ডিং।

ব্যবসাটা বেশ জমজমাট। যারা ভালো কোচিং চালান, তারা একটা সাধারণ টিউশনির চেয়ে বহুগুণ বেশি আয় করেন। তাদের ছাত্ররাও নির্দিষ্ট ওই পরীক্ষাগুলোতে ভালো রেজাল্ট করে। সিস্টেমের নিজস্ব মাপকাঠিতে বিচার করলে, কোচিং তার প্রতিশ্রুতি রাখে।

// কোচিং আসলে কী বেচে

তবে যা বিক্রি হচ্ছে সেটা শিক্ষা না। সেটা একটা ক্রিডেনশিয়াল ল্যাডার — সফলতার সিঁড়ি।

গল্পটা হলো এমন: প্রথমে জিপিএ ৫, তারপর বুয়েট, মেডিকেল বা ঢাকা ইউনিভার্সিটি, এরপর একটা ভালো চাকরি— ব্যস, তোমার বাকি জীবন সেট। এই সিঁড়ির যেকোনো একটা ধাপে হোঁচট খাওয়া মানে জীবনের পুরো যাত্রাতেই ফেল করা। সবচেয়ে বড় কোচিংগুলো তাদের ছাত্ররা যখন টপ ইউনিভার্সিটিতে চান্স পায়, তখন বিশাল সেলিব্রেশন প্রোগ্রাম করে— যেন বেহেশতের টিকিট বিলি করা হচ্ছে। মার্কেটিংয়ের কারণে এই ধারণাটা আরও পাকাপোক্ত হয়। সেই চাপ গিয়ে পড়ে বাবা-মায়ের ওপর। বাবা-মা সেই চাপ দেয় সন্তানদের।

আমি যাদের পড়াই, তাদের বেশির ভাগই আমার সামনে বসার আগেই এই ধারণাটা মগজে ঢুকিয়ে ফেলে। তাদের ভেতরে গেঁথে গেছে — কোনো এক বিশেষ ইউনিভার্সিটিতে চান্স না পেলে তাদের জীবন শেষ। তাই যখন আমি বিষয়টা যেভাবে পড়ানো উচিত সেভাবে পড়াতে যাই — একটু ধীরস্থির হয়ে, কৌতূহল নিয়ে, বা হয়তো সিলেবাসের বাইরের কোনো সম্পর্কিত বিষয়ে কথা বলতে যাই — তারা আমার দিকে কিরকম করে তাকায়। সামনে পরীক্ষা আছে। সময় নেই। যে জিনিসটা নিয়ে আমি এইমাত্র রোমাঞ্চিত হলাম, সেটা তো আর সিলেবাসে নেই!

আমি পড়াশোনার ওপর মার্কেটিং চাপাতে পারি না। জানি, এটা আমার সমস্যা — অন্য কারো না।

// বিষয়টা কেন ব্যক্তিগত

সিস্টেম সংস্কার করা উচিত কি না, সেই তর্কে আমি যাচ্ছি না। নিজের পড়াশোনা নিয়ে মানুষ কী করবে, সেটা তাদের ব্যাপার। অনেকেই খুব প্র্যাকটিক্যাল কারণে পড়াশোনাকে স্রেফ একটা সার্টিফিকেট বানানোর মেশিন হিসেবে দেখে, সার্টিফিকেটটা নেয়, আর নিজের জীবনে এগিয়ে যায়। তাদের জন্য এটা ঠিক আছে।

কিন্তু আমার জন্য ঠিক না। আমি ওভাবে তৈরি না। পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়তে পারি না, অন্যদের পরীক্ষায় পাশ করানোর ব্যবসা দাঁড় করাতেও পারি না। ভাবনাটাই আমার ভেতরের খুব মৌলিক কিছু একটাকে নাড়া দেয়।

আমি কোনো রোবট না, আর আমি শুধু মরার জন্য বাঁচতে চাই না — বাকিদের মতো একই চক্রে ঘুরতে চাই না। খাওয়া, ঘুমানো, ইনকাম, আবার একই কাজ। আমার পরিচিত গণ্ডির মধ্যে হয়তো আমিই একমাত্র মানুষ যার কাছে এই চক্রটা অসহ্য লাগে। এটা কোনো অভিযোগ নয়। এটা স্রেফ আমার নিজের সম্পর্কে একটা সত্য, যার সাথে আমি আপস করে চলতে শিখেছি।

// কোচিং খোলার সেই প্রস্তাব

আমাকে অনেকবার কোচিং সেন্টার খোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মা, কিছু ছাত্র, বা যারা আমাকে পড়াতে দেখেছে— তারা সবাই ধরে নিয়েছে যে আমি হয়তো আমার এই স্কিলটাকে ওভাবেই কাজে লাগাতে চাইবো। প্রতিবারই আমি 'না' বলেছি।

এমনিতে নিজে থেকে এই চিন্তা কখনো আমার মাথায় আসে না। যখন অন্য কেউ কথাটা তোলে, কেবল তখনই এটা নিয়ে ভাবি। আর যখন ভাবি, তখন নিজের এমন একটা ভার্সনকে চোখের সামনে দেখতে পাই— যেটা আমি কোনোভাবেই হতে চাই না। দেয়ালে দেয়ালে আমার মুখের ছবি দেওয়া পোস্টার। পরীক্ষার রেজাল্টের গ্যারান্টি। বিশাল বিশাল ব্যাচ, তাদের হাতে সার্টিফিকেট ডেলিভারি দেওয়ার জন্য বানানো একটা রুটিন। যে কৌতূহলটা আমাকে শুরুতে পড়ানোর দিকে টেনে এনেছিল, ব্যবসার গ্যাঁড়াকলে পড়ে সেটা ধীরে ধীরে দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে।

টাকাটা হয়তো এখন যা কামাই, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি হতো। কিন্তু এই হিসাব-নিকাশ আমাকে টানে না। কখনোই টানেনি। এটাই আমাকে অদ্ভুত করে তোলে হয়তো — টাকা যে আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি সেটা না, বরং টাকা জিনিসটা কখনোই আমার কাছে মূল প্রস্তাবের কোনো অংশ ছিল না।

// কোথায় যেন একটা দ্বন্দ্ব

এখানে একটা বিষয়ে আমি ভান করতে চাই না। আমি এখনো সিস্টেমের ভেতরেই আছি। পরীক্ষার ছাঁচেই আমাকে পড়াতে হয়, কারণ যে ছাত্ররা আমার কাছে আসে তারা পরীক্ষার প্রস্তুতিই নিচ্ছে। তাদের সামনে বসিয়ে আমি যেভাবে পড়াতে চাই, সেভাবে পড়ানোর উপায় নেই। সামনেই তাদের পরীক্ষা। আর পরীক্ষা কৌতূহলের ধার ধারে না। তাই বাধ্য হয়ে তাদের জায়গাতেই আমাকে নামতে হয়, এবং মাঝে মাঝে এই বিষয়টা আমার নিজের কাছেই বিরক্তিকর লাগে।

নিজেকে তখন এটাই বোঝাই যে, অন্তত ওয়ান-টু-ওয়ান পড়ানো মানে এই ক্ষতিটাকে স্কেল করা বা হাজার জনের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া নয়। আমি বিজ্ঞাপন দিই না। নিজের মুখের পোস্টার লাগাই না। ছাত্রদের বলি না যে একটা নির্দিষ্ট রেজাল্টের ওপর তাদের জীবন নির্ভর করছে— যেখানে সিস্টেমের বাকি সবাই তাদের ঠিক এটাই বলছে। মাঝে মাঝে, যখন কোনো ছাত্র সামান্যতম সুযোগ দেয়, আমি চুপ করে একটা ছোট্ট বাস্তবতার কথা ঢুকিয়ে দিই: জীবনটা কোনো সিঙ্গেল রোড না, আর তারা পরীক্ষাকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে, এটা আসলে ততটাও না।

এরপরও, এটা একটা আপস। আমি টিউশনি করি কারণ এটা থেকে টাকা আসে, আর ব্যক্তিগতভাবে পড়ানোর কারণে কোচিংয়ের মতো স্কেল করার ক্ষতিটা অন্তত হয় না। এটাই সবচেয়ে সৎ স্বীকারোক্তি যেটা আমি লিখতে পারি।

// বরং যা বানাতে চাই

আমি কোনো বিকল্প কোচিং সেন্টারের প্রস্তাব দিচ্ছি না। আমার মাথায় তেমন কোনো মডেল নেই।

আমার যেটা আছে, সেটা হলো টিউশনির বাইরে আমার বাকি সব কাজ: একটা ওয়েবসাইট যেটা আমি নিজের মতো করে সময় নিয়ে সাজাচ্ছি, কিছু গেম বানাচ্ছি, এরকম কিছু প্রবন্ধ লিখছি, আর ভবিষ্যতে হয়তো এমন কিছু আর্টিকেল লিখবো যেখানে কনসেপ্টগুলো ঠিক সেভাবে বোঝানো থাকবে— যেভাবে আমি নিজে বুঝতে চেয়েছিলাম। এই জিনিসগুলো কোনো কিছুর প্রস্তুতির জন্য বিক্রি করা হয় না। এগুলো বানানো হয় কারণ স্রেফ কাজটা করাই একটা প্রাপ্তি।

কোচিংয়ের যদি কোনো বিকল্প থাকে, তবে তা হলো এটাই— এমন কাজ যার মূল্য কাজটার মাঝেই নিহিত, সেই কাজ শেষে পাওয়া সার্টিফিকেটের মাঝে নয়।

আমি এখন জানি, কোচিং খোলার প্রস্তাবে যে ভার্সনটা 'হ্যাঁ' বলতো, তাকে দেখতে কেমন হতো। অন্য মানুষদের মাঝে আমি তার অনেকগুলো রূপ দেখেছি। তারা কেউ খারাপ মানুষ নয়। তারা শুধু এমন একটা আপস করেছে, যেটা আমি করতে চাই না।

> আমি ছোট থাকতেই রাজি।

> আমি জানি এর দাম কত। আর আমি এও জানি, ছোট না থাকার দাম কত।

> দ্বিতীয় দামটা চুকানোর সামর্থ্য আমার নেই।

— nj · 2026-05 · ~৭৫০ শব্দ · ৪ মিনিট