মেডেল বিক্রি করে কি টাকা পাওয়া যায়?
nj · মে ২০২৬
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস। একটা হাফ ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার জন্য আমাকে ঢাকা যেতে হয়। টিউশনি থেকে ছুটি নিই। তখনই আমার ছাত্ররা জানতে পারে আমি ম্যারাথনে দৌড়াই। আমার বয়স তখন ২৪, ৩ মাস ধরে এই ইভেন্টের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি। এই ছুটি নেওয়ার আগে ফ্যামিলির বাইরে তেমন কেউ জানতো না।
দৌড় শেষ করে ফিরে আসার পর তারা আমার মেডেলটি দেখতে চায়, জানতে চায় ইভেন্ট সম্বন্ধে। মেডেলটি দেখে তাদের একজন সরাসরি বলে বসে— আজাইরা কাজ, এটা দিয়ে কোনো চাকরি জুটবে কি? বা কোনো ইনকাম হবে কি? বাকিরাও একটু ভদ্রভাবে একই সংশয় প্রকাশ করলো: যে দৌড়ে কোনো টাকা পাওয়া যায় না, তার পেছনে সময় আর অর্থের অপচয় কেন? রাস্তায় দৌড়ানোর সময় কি নিজেকে ক্লাউনের মতো লাগে না?
তখন আমি কোনো উত্তর দিইনি। আমার প্রশ্নকর্তাকে মনে আছে— সবাইকে মনে আছে এখনো।
শুধু তখন না, এরকম প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। এ প্রশ্নগুলো একরকম আমার জীবনের অংশই হয়ে গেছে।
এই প্রশ্নগুলোর মূলে একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে— সময় এবং অর্থের একমাত্র সার্থকতা হলো তা দিয়ে ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যৎ গড়া। বাংলাদেশে, যেখানে বেশির ভাগ পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুতোর ওপর ঝোলে, যেখানে একটা ভালো বা খারাপ চাকরি নির্ধারণ করে দেয় বাবা-মা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে কি না— সেখানে এই চিন্তাধারা কোনো বোকামি নয়। এটা আসলে সারভাইভাল হিউরিস্টিক— টিকে থাকার কৌশল। যে কাজ থেকে কোনো দৃশ্যমান লাভ নেই, সেখানে সম্পদ, শ্রম বা সময় বিনিয়োগ না করেই মানুষ এখানে বেঁচে থাকতে শেখে।
কিন্তু এটা স্রেফ একটা কৌশল, ধ্রুব সত্য নয়। পেটে ভাত আর হাতে নতুন আইফোন চলে আসার মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে এই কৌশল আপনাকে আর রক্ষা করে না, বরং আপনার জগতটাকে ছোট করে দেয়। আপনি এমন একজন মানুষে পরিণত হন, যে কেবল টাকার বিনিময়েই কাজ করতে পারে। যে কেবল ক্যারিয়ারে লাগবে এমন জিনিস থেকেই আনন্দ পায়। যার কাছে "এসব করে কী লাভ?"— এই প্রশ্নের একটাই গ্রহণযোগ্য উত্তর থাকে: টাকা অথবা স্ট্যাটাস।
মেডেল নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ফিতায় ঝোলানো এক টুকরো লোহালক্কড় — দেখতে সুন্দর হলে একটু ভালো লাগে, এই আরকি। এমন সতেরটা মেডেল আমি জিতেছি, এগুলো রেসের পর না পেলেও আমার দিল ভেঙে টুকরা টুকরা হতো না।
মেডেলটা আসলে একটা 'রসিদ' বা প্রমাণপত্র। এই মেডেলগুলো আসলে প্রমাণ করে যে, কোনো এক সকালে, কোনো এক শহরে, আমি ২১ কিলোমিটার দৌড়েছিলাম। বা ৪২ কিলোমিটার। অথবা একটা ইঞ্জুরড হাঁটু নিয়ে ৫২ কিলোমিটার— যার শেষ ২৬ কিলোমিটার আমাকে লাঠিতে ভর করে হাঁটতে হয়েছিল। মূল্যটা মেডেলে নয়, কাজটা করার মধ্যে, দৌড়ের মধ্যে। মেডেলটা শুধু প্রমাণ করে যে আমি কাজটা করেছিলাম।
যারা মনে করে মেডেল পাওয়াই মূল উদ্দেশ্য, তারা আসলে পুরো ব্যাপারটাই ধরতে পারেনি।
ফিটনেসের জন্য আমি দৌড়াই না। ফিটনেসটা পাশাপাশি হয়ে যায়।
সত্যি বলতে, ম্যারাথন আমার কাছে পাহাড়সম কঠিন বলে মনে হয়। আর যখন কোনো কাজ এতটা কঠিন, তখন আমি জানতে চাই আমি সেটা করতে পারি কি না। ব্যাস, এটাই পুরো কারণ। স্বাস্থ্যের জন্য না। স্ট্যাটাসের জন্য না। এমনকি কঠিন কাজ চরিত্র গঠন করে— এই ধারণার জন্যেও না। শুধু— এই জিনিসটা অসম্ভব মনে হচ্ছে। চেষ্টা তো করে দেখি।
সবকিছুর পেছনে জাগতিক উদ্দেশ্য থাকা জরুরি নয়। কিছু কাজ স্রেফ এই কারণেই করার মতো— কাজটা কঠিন, আর আপনি চেষ্টা করতে চান।
পল গ্রাহামের কিছু প্রবন্ধ মাঝেমাঝে পড়া হয়েছে। তিনি তার 'The Bus Ticket Theory of Genius' প্রবন্ধে বলতে চেয়েছেন— যারা সত্যিই বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ কিছু করবে, তাদের চেনার উপায় হলো তারা কোনো কিছুর প্রতি পাগলের মতো মেতে থাকে। কোনো ক্যারিয়ার বা ফলাফলের চিন্তা ছাড়াই, স্রেফ কাজটার প্রতি তীব্র আগ্রহ থেকে তারা সেটা করে। যদিও তিনি বিজ্ঞানী বা লেখকদের বুঝাতে হয়তো এটা লিখেছিলেন, কিন্তু কমবেশি সবক্ষেত্রেই সেইম স্ট্রাকচারটা খাটে বলে আমি মনে করি।
আমি কোনো জিনিয়াস নই। তবে আমি প্যাটার্নটা বুঝি। যেকোনো ক্ষেত্রে যারা বড় কিছু করেছে, তারা প্রায় সবাই শুরুতে কাজটা বিনা পয়সায়, এভারেজ উপায়ে, লোকচক্ষুর আড়ালে করেছে— যখন কেউ দেখছিল না এবং শেষে কোনো মেডেলও ছিল না। আল্ট্রা-ম্যারাথন দৌড়ানো কোনো যুগান্তকারী কাজ নয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রাপ্তির আশা ছাড়া কঠিন কাজ করার যে মানসিক সক্ষমতা, সেই একই সক্ষমতাই মানুষকে ভবিষ্যতে বড় কাজ করতে সাহায্য করে। এই মানসিক পেশিটা ব্যবহার করতে করতেই শক্ত হয়।
আর এই পেশিটা আমার ভেতর না থাকার চেয়ে, থাকাটা আমি বেশি জরুরি মনে করি।
উপরে যতো কথা বললাম, এর কোনো কিছুই হয়তো ওভাবে কাউকে বলিনি। বললে তারা হয়তো ভুল বুঝতো, বা মনে করতো আমি রেগে গেছি, অথবা জ্ঞান দিচ্ছি। চারপাশের পরিবেশ তাদের যে ভাষা শিখিয়েছে, তারা সেই ভাষাতেই সততার সাথে প্রশ্ন করেছিল। সেই বাচ্চাদের সাথে তর্কে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।
কিন্তু এই সাইটেই একটা পেইজ আছে— সেখানে আমার মেডেল, আমার দৌড়ের সব ইতিহাস, আমার শেষ করা প্রতিটি রেস আর যেগুলো করতে পারিনি, সব কিছু লেখা আছে। ওটাই আমার পুরো উত্তর। তারা চাইলে এটা পড়তে পারে। না চাইলে নাই।
> আমি মেডেলের জন্য দৌড়াইনি। কাউকে দেখানোর জন্যও দৌড়াইনি। আমি দৌড়েছিলাম কেবল
> নিজেকে যাচাই করার জন্য— দেখার জন্য যে, আমি আসলেই এটা পারি কি না— এটাই।