writing/essays/on-forgetting.bn.md
[en][bn]

সব মনে রেখে কী লাভ?

nj · মে ২০২৬

আমার ছাত্ররা আমাকে "ব্রেইনি গোল্ডফিশ" বলে ডাকে। তারা ভালো অর্থেই ডাকে। ব্যাপারটা এখন একটা রানিং জোক হয়ে গেছে— হয়তো আমি মনোযোগ দিয়ে কোনো প্রবলেম সলভ করাচ্ছি, হঠাত স্ট্যান্ডার্ড সলিউশনটা ভুলে গেলাম, একটু থামলাম, তারপর তাদের সামনেই সম্পূর্ণ অন্য কোনো উপায়ে নতুন একটা ডেরিভেশন দাঁড় করালাম। তারা অপেক্ষা করে। তারা এই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত। কেউ একজন গোল্ডফিশ জোকটা মারে। এরপর আমরা আবার পড়ালেখায় ফিরে যাই।

মানুষ আশা করে আমি যেসব জিনিস মনে রাখবো, তার অনেক কিছুই আমার মনে থাকে না। যাদের সাথে দেখা হয়েছে তাদের নাম, নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ, বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার করা ফর্মুলা, কিংবা পড়ে শেষ করা বইয়ের কাহিনী— কিছুই মনে থাকে না। গোল্ডফিশ নামটা আসলে একদম মানিয়ে যায়। আমি এটা নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়েছি।

কিন্তু এই লেখায় আমি সেই কথাটাই বলতে চাই, যেটা এই জোকের আড়ালে বাদ পড়ে যায়।

// ভুলে যাওয়া আসলে কী কাজ করে

বেশিরভাগ মানুষ ভুলে যাওয়াকে একটা ঘাটতি বা দুর্বলতা হিসেবে দেখে। এমন একটা কিছু যার বিরুদ্ধে ফ্ল্যাশকার্ড, স্পেসড রিপিটেশন বা নেমোনিক্স দিয়ে লড়াই করতে হবে। স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর পুরো কনসেপ্টটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা ধারণার ওপর— লক্ষ্য হলো আরও বেশি মনে রাখা, আরও বেশি অতীতকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা।

আমার মনে হয় ধারণাটা আংশিক ভুল। ভুলে যাওয়া মানেই শুধু হারিয়ে ফেলা নয়। এটা একটা মেকানিজমও। মন নিজেকে ব্যবহারযোগ্য রাখার জন্যই এই কাজটা করে।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো শোক। যে মানুষটা সত্যিকারের শোকের ভেতর দিয়ে গেছে, সে কখনোই চায় না সেই কষ্টটা চিরকাল একই তীব্রতা নিয়ে মনে থাকুক। শুধু সময় কখনো খুব একটা ঘা শুকায় না। মানুষকে আসলে যা বদলায়, তা হলো ভুলে যাওয়া, ঘটনাটাকে নতুনভাবে দেখা আর সময়ের ব্যবধান— এই তিনটির একটা মিশেল। স্মৃতিটা থেকে যায় ঠিকই, কিন্তু তার সাথে লেগে থাকা অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়। একসময় সেই ঘটনার কথা বলা যায়, অথচ সেই ঘটনার কষ্টটা আর গায়ে লাগে না। কখনো কখনো এটা এক ধরনের ড্যামেজ। কখনো এটা পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া। ভেতর থেকে অনেক সময়ই এই দুটোর পার্থক্য বোঝা কঠিন।

একই কথা রাগ বা লজ্জার ক্ষেত্রেও সত্যি। দশ বছর আগে যে মানুষটার সাথে অন্যায় হয়েছিল বা যে নিজে ভুল করেছিল, তার ক্ষেত্রেও এটা সত্যি। এগুলো আরও স্পষ্টভাবে মনে রেখে কেউ শান্তি পায় না। মানুষ শান্তি পায় কারণ সেই অনুভূতিগুলো কেমন ছিল, তা তারা ধীরে ধীরে ভুলে যায়।

// আমার নিজের গল্পটা

আমি বেশিরভাগ মানুষের চেয়ে বেশি ভুলি। একসময় এর জন্য আমার খারাপ লাগতো। এখন মনে হয়, আমি যে ভালো আছি তার পেছনে এটাও একটা কারণ।

কাছের মানুষজন জানে, আমার নিজের জীবনের কঠিন ঘটনাগুলো ঘটার সময় যে তীব্রতা ছিল, সেটা আমি পরে আর অনুভব করতে পারি না। ঘটনাগুলো যে ঘটেছিল, তা আমার মনে থাকে, কিন্তু সেই অনুভূতিটা নাগালের বাইরে চলে গেছে। আমার জন্য এটা এক ধরনের দয়া। এরকম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাওয়া অনেকের কাছেই ভুলে যেতে না পারাটা সবচেয়ে কষ্টের— তাদের কাছে অতীতটা একদম জীবন্ত হয়ে থাকে এবং বারবার তার মাশুল গুনতে হয়। আমাকে সেটা গুনতে হয় না। এটা এমন কোনো গুণ নয় যা আমি নিজে অর্জন করেছি, আমার ব্রেইন কাজই করে এভাবে। তবে হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই আমি কঠিন বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি অতশত না ভেবে, মনের ভেতর ক্ষোভ পুষে রাখতে পারি না, এবং পুরোনো বন্ধুদের সাথে পুরোনো ঝগড়াগুলো বেশিরভাগ সময়ই সত্য আর গুজবের মাঝামাঝি কোনো একটা জায়গায় চলে যায়।

ঘটনার মূল কাঠামোটা মনে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের আবেগটা বা ঘটনার ডিটেইলস কেমন ছিল, তা ভুলে যাই। কোনো কিছু যা শিখিয়েছে, সেটা থেকে যায়। কিন্তু সেই সময়ের অনুভূতিটা সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে যায়। সাধারণত শিক্ষাটা থেকে যাওয়ার আগেই ক্ষতটা শুকিয়ে যায়। আমি এখন এই ব্যাপারটার জন্য কৃতজ্ঞ।

// দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব

এর একটা চড়া দাম আছে এবং এ নিয়ে কোনো ভান করার কিছু নেই। যারা আমার সাথে ভালো আচরণ করেছে, আমি তাদের নাম ভুলে যাই। পড়ে শেষ করা পুরো একটা বই মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়। গত সপ্তাহে একটা আড্ডায় কী বলেছিলাম, তা সবসময় মনে করতে পারি না। এগুলো ছোটখাটো বিষয় নয়— মানুষ আমাকে কীভাবে এক্সপেরিয়েন্স করে তার ওপর এগুলো প্রভাব ফেলে, আর মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষকে কষ্ট দেয় যারা হয়তো আমার কাছে আরও বেশি মনে রাখার দাবিদার ছিল।

মানুষ আসলে স্মৃতির মাধ্যমেই অনুভব করে যে কেউ তাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। খুব বেশি ভুলে যাওয়ার স্বভাব একজন মানুষকে এমনভাবে হালকা করে দেয়, যেটা অন্যের চোখে সবসময় ভালো ঠেকে না।

কিন্তু এর বদলে আমি একটা বই নতুন করে পড়ার আনন্দ পাই। যে টপিকটা একশোবার পড়ানো হয়েছে, সেটাও পড়ানোর সময় নতুন কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়। আর জীবনের সবচেয়ে ভারী স্মৃতিগুলো, যেগুলো বয়ে বেড়িয়ে কোনো লাভ হতো না— সেগুলো থেকে আমি নিঃশব্দে মুক্তি পেয়েছি। একবে এসব মাথা থেকে নামবে, সেই চিন্তা আমাকে করতে হয়নি।

// যারা আমার মতো, তাদের জন্য

যদি কেউ এমন হয় যে কিনা ভুলে যায়— মানুষের নাম, ঘটনা, কিংবা নিজের অতীতের বিস্তারিত বিষয়— তাকে এটা বলা যায় না যে এটা একটা অ্যাডভান্টেজ। সোজাসাপ্টা বললে, এটা তা নয়। কিন্তু এটা কেবল একটা দুর্বলতাও নয়।

স্মৃতি নিয়ে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি একপাক্ষিক। যারা সবকিছু মনে রাখতে পারে, তাদের আমরা মাথায় তুলে নাচি। আর যারা পারে না, তাদের নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তা করি। স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর পেছনে পুরো একটা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু ভুলে যাওয়া যে কোন দিক দিয়ে ভালো, সেটা নিয়ে কেউ কথাই বলে না। অথচ আমরা সাধারণত যেসব কারণে স্মৃতি ধরে রাখতে চাই, তার চেয়েও বেশি জরুরি কিছু ক্ষেত্রে এই 'ভুলে যাওয়া' জিনিসটা দারুণ কাজে দেয়।

কেউ যদি নিজের এই 'ভুলে যাওয়া'র স্বভাবটাকে ঠিক করতে চায়, তবে আগে দেখা উচিত সে আসলে কী ঠিক করতে চাইছে। চাকরির জন্য যদি কোনো তথ্য মনে রাখতে হয়, তবে সেটা ভিন্ন একটা বিষয় এবং তা সমাধানের উপায়ও আছে। কিন্তু কেউ যদি কোনো অনুভূতি ধরে রাখতে চায় এই ভেবে যে, এটা ধরে রাখলে কোনো ব্যক্তি বা মুহূর্তের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা হবে— তখন একবার ভেবে দেখা উচিত, ওই অনুভূতির যতটুকু দেওয়ার ছিল, সেটা দেওয়া হয়ে গেছে কি না। কিছু অনুভূতি সাময়িক হওয়ার জন্যই আসে। মানুষ যখন তাদের জোর করে আটকে রাখা বন্ধ করে, তারা ঠিক সময়ে বিদায় নেয়। আর শেষে শুধু সেটাই পড়ে থাকে, যা তারা শিখিয়েছে। এটাই তো মূল উদ্দেশ্য ছিল।

// যে কথাগুলো বলা হয়নি

সব ভুলে যাওয়াই কিন্তু আশীর্বাদ নয়। কিছু মানুষ তাদের নিজেদের এমন কিছু অংশ হারিয়ে ফেলে যেগুলো তারা ধরে রাখতে চেয়েছিল। কিছু স্মৃতি ধরে রাখা জরুরি কারণ সেগুলো ভালোবাসা, দায়িত্ব বা অন্য কাউকে দেওয়া কথার সাথে জড়িয়ে থাকে। ভুলে যাওয়া মানেই অটোমেটিক্যালি উইজডম বা প্রজ্ঞা নয়। কখনো এটা এড়িয়ে যাওয়া। কখনো এটা ক্ষত। আবার কখনো এটা স্রেফ হারিয়ে ফেলা।

> আমি একটা গোল্ডফিশ। এবং আমি এটা মেনে নিয়েছি।

> গোল্ডফিশ খুব বেশি ভুলে যায়। কখনো এটা ট্র্যাজিক মনে হয়।

> আবার কখনো এটা আশীর্বাদ মনে হয়।

— nj · 2026-05 · ~৭০০ শব্দ · ৪ মিনিট